হটাৎ দেখা
ভাবছিলাম আমার "বাংলা লিখুন" এর বন্ধুদের কথা, তারা কি পড়তে ভালো বাসে,পছন্দ করে, আনন্দ পায়
ইত্যাদি ! এইসব ভাবছি এমন সময় শুনলাম রবি ঠাকুরের আবৃতি "হটাৎ দেখা" আর আমার মনে পড়লো এই গল্পটা !সঙ্গে সঙ্গে লিখে ফেললাম মনে হয় বন্ধুদের ভালো লাগবে !
=================================
সুধা আমার থেকে দু বৎসর জুনিয়ার ছিল কলেজ ! আমি একবার ক্লাসে গাড্ডা খাওয়াতে ও আমার এক ক্লাস নিচে
হলো ! সুধা ওর বাবার ভোপাল থেকে ট্রান্সফার হওয়ার দরুন সেখান থেকে আমাদের শহরে এসেছিলো ! একদিন আমি একলা কেমিস্ট্রি ল্যাবে বসে একটা নোট লিখছিলাম হটাৎ সুধা এসে আমাকে নমস্কার করে বললো স্যার আমার নাম সুধা আমাকে একটু হেল্প করবেন ?
এটা আমাদের প্রথম মিলন ছিল আর আমি সুধা কে জানতাম না আর আগে দেখিনি কোনো দিন ! আমি ওর দিকে তাকালাম মেয়েটি বেশ সুন্দর লম্বা চুল দেখতে বেশ ভালোই ! আমি ওকে প্রতি নমস্কার করে বললাম এই ল্যাবে অন্য স্টুডেন্টদের ঢোকা ব্যারন তুমি জানো ?
সুধা বললো জানি স্যার তবে আপনাকে একলা পাবো বলে এসেছি !
আমি বললাম একলা মানে তুমি কি করতে চাও ? ও বললো কিছু না এই এপ্লিকেশন ফর্ম টা ভরতে একটু সাহায্য করলে বাধিত হবো !
আমি বললাম এই কথা, আমি তো ঘাবড়ে গিয়েছিলাম,এই ভেবে কি তোমার মতো একজন সুন্দরী আমার কাছে কি চায় ? সুধা লজ্জা পেলো আর বললো ধন্যবাদ স্যার আপনিও খুব চারমিজি আর হ্যান্ডসম ! আমি বললাম "মাকাল ফল" আমি কোনো কর্মের নয় একবার গাড্ডা খেয়েছি ! সুধা বললো এরকমটি আর বলবেন না স্যার !
আমি বললাম সুধা এখন ক্লাস শুরু হবে তুমি একটার পরে এস কিংবা ফর্মটা আমার কাছে রেখে যাও আমি ভরে জমা করে দেব ! সুধা আমাকে ফর্ম দিয়ে চলে গেলো !
আমি তো ফর্ম ভরতে গিয়ে অবাক হলাম সুধার এডুকেশনাল ব্যাকগ্রাউন্ড দেখে, সে অসাধারণ মেধাবী ছাত্রী সমানে ফার্স্ট সেকেন্ড হয়ে আসছে ! আর ও ন্যাশনাল স্কলারশিপ হোল্ডার ! পাস্ করলেই চাকরি !
আমার নিজেরই লজ্জা হচ্ছিলো ওর সঙ্গে ওই ভাবে কথা বলার জন্য ! ভাবলাম একবার সরি বলবো ! তার পর দু একবার সুধার সাথে করিডরে দেখা হয়ে ছিল আর নমস্কার বিনিময় হয়েছিল ! কিন্তু আমার মনে সবসময়ে ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স ছিল আর আমি ভাবতাম আমিও যদি মন দিয়ে পড়া শোনা করতাম তাহলে সুধার সাথে বন্ধুত্ব করতাম ! যাক যা হবার নয় তা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নাই !
আমি পরীক্ষার পর আসানসোল বাবার কাছে চলে এলাম ! বাবা যে কোম্পানিতে কাজ করতেন সেই কোম্পানি আমার জন্য কাজ জোগাড় করে দিলো !
জুন মাসে খবরের কাগজে রেজাল্ট বেরোলো আমি আমার ফাইনাল রেজাল্ট টা দেখার পর সুধার রেজাল্ট দেখলাম !
পরের বছর কনভোকেশনে গেলাম ডিগ্রি নিতে ! সেখানে গিয়ে শুনলাম সুধা সেই বছর ইউনিভার্সিটি তে টপ করে স্কলারশিপ নিয়ে ডক্টরেটে করছে ! মনে মনে ভাবলাম এত ভাল স্টুডেন্ট, হওয়া উচিত আমার মত গাড্ডা খাওয়া স্টুডেন্ট তো নয় ! তবে জেনে আশ্চর্য হলো যে সুধা আমার খোঁজ করতো আর আমি যে বাসায় থাকতাম সেখানে গিয়ে খোঁজ খবর নিয়েছে অনেকবার আমি এখন কোথায় আছি !
আমি ডিগ্রি নিয়ে চলে আসলাম ! আমার কর্ম ক্ষেত্রে যে গুরু ছিলেন তিনি আমাকে ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স থেকে বের করলেন তিনি আমাকে বললেন ডিগ্রি শুধু মাত্র তোমাকে শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রদান করে ! তুমি কাজকে ভালোবাস তুমি কাজে প্রথম হও !আমি সংকল্প নিলাম খুব মন দিয়ে কাজ করবো যাতে কাজে প্রথম হতে পারি !
এরপর আমার বিবাহ হলো সন্তান হলো আমি সুধা কে ভুলে গেলাম ! এরপর আমি ডক্টরেটে করলাম আর কর্ম ক্ষেত্রে প্রমোশন পেতে পেতে জেনারেল ম্যানেজার পদে পদস্থ হলাম !
তখন আমার বিরাট প্রতিপত্তি ! বিরাট ল্যাবরেটরি আমার কন্ট্রোলে বহু রিসার্চ হচ্ছে দেশে বিদেশে আমার লেখা আর্টিকেল ছাপছে ! আমি এডুকেশন ফিল্ডে থাকলে এসব কিছুই হত না মনে হয় ! কিন্তু সুধার কাছ থেকে অদৃশ চাপ সৃষ্ঠি না হলে হয়ত মাস্টার মশাই হয়ে পড়াতাম আর পড়ানতে সুখ্যাতি পেতাম কিনা তাতেও সন্দেহ আছে !
একবার আমি প্রতিরক্ষা দপ্তরের অনুরোধে হটাৎ একটি বিশেষ অ্যালুমিনিয়াম আলোয় সংক্রান্ত ব্যাপারে হায়দরাবাদ গিয়ে ছিলাম ! পুজোর ছুটির দরুন ট্রেনে /প্লেনে কোনো জায়গা পাওয়া যাচ্ছিলোনা প্রতিরক্ষা দপ্তরের কোটাও ফুল তবে একজন এজেন্ট বলেছে যে একটা এসি ফার্স্ট ক্লাসকূপে তে একটা সিট খালি আছে নাগপুর পর্যন্ত আর নাগপুর থেকে আমাকে বাই রোড যেতে হবে ! আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম আর সন্ধ্যা বেলা আমাকে প্রতিরক্ষা বিভাগের লোকেরা দলবল নিয়ে এসে আমাকে কেবিন এ তুলে দিয়ে গেলো !
গাড়ি ছাড়লেপরে আমি দেখলাম আমার সহযাত্রী একজন মহিলা ! আমি নমস্কার করে মহিলা কে বললাম সরি ম্যাডাম আপনাকে বিরক্ত করবার জন্য !
হটাৎ আমার মনে হলো মহিলাকে যেন কোথাও দেখেছি !মহিলা আমাকে নিজের পরিচয় দিলেন ভাইস চ্যান্সেলর নাগপুর ইউনিভার্সিটি মিস সুধা শ্রীবাস্তব আমি বললাম আমার নাম প্রদীপ মৈত্র ! মহিলা আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন স্যার আপনি ? আমি বললাম সুধা তুমি ?
আমি ভালো করে চেয়ে দেখলাম সুধা সেই আগের মতোই আছে চুল পেকেছে চশমা লেগেছে ! সুধা বললো তোমার এক মাথা টাক দেখে তোমাকে চিনতে পারিনি ! সুধা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমার কথা শুনলো !
আমি বললাম তোমার কথা বলো !সুধা বললো আমার কোনো কথা নাই নিঃসঙ্গ জীবন !
আমি বললাম তুমি বিয়ে করোনি ? সুধা বললো আমার মতো বিদুষি মহিলা কে বিয়ে কে করবে ? যে করতে পারতো সে তো আর ধরা দিলোনা ! তাই আমি একাকিনী ! আমি জিজ্ঞাসা করল কে সেই হতভাগা যে তোমার মতো সুন্দরী আর বিদুষিকে প্রত্যাখ্যান করেছে ! সুধা বললো এখন আর বলতে দোষ নাই সে আমার সামনে বসে আছে !
আমি বললাম সে কি সুধা তুমি তো কখনো আমাকে তোমার মনের কথা বলোনি ?
কি করে বলবো প্রথম দিন তুমি আমাকে লিফ্ট দিলে না বরঞ্চ আমার আবার তোমার সাথে দেখা করার পথ বন্দ করে দিলে আমার এপ্লিকেশন ফর্ম নিজে ভরে নিজেই জমা দিয়ে দিলে, আর পরীক্ষার পর শহর ছেড়ে কোথায় চলে গেলে কেউ বলতে পারলোনা !
আমি স্তম্ভিত হয়ে সুধা কে বললাম তোমার আমার বন্ধুত্বের বাধক হয়ে ছিল তোমার ওই এপ্লিকেশন ফর্ম ! সুধা আশ্চর্য্য হয়ে বললো সেটা কি করে ? আমি বললাম তোমার একাডেমিক রেকর্ড দেখে আমি ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স এ ভুগছিলাম তাই তোমার থেকে দূরে চলে গিয়ে ছিলাম, এমনটি নয় যে তোমাকে আমি পছন্দ করিনি !
-----
হটাৎ দেখা ---দ্বিতীয় পর্ব
আমি বললাম সুধা তোমার এতো প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও কেন তুমি আমার মতো একটি সাধারণ ছেলেকে যার কোনো ভবিষৎ নাই, মনের মধ্যে রোমান্টিক ফিলিং নাই তার প্রতি কেন অনুরক্ত হলে ?
সুধা বললো আমার মা বাঙালি ছিলেন আর আমি বাঙালিদের ভালোবাসি আর প্রথম দিন কলেজ এসে তোমাকে দেখে আমার খুব ভালো লেগেছিলো ! তুমি যে কিশোরে কুমারের গান গাইতে কলেজ ফাঙ্কশনে আমি তোমার গান শুনে পাগল হয়ে যেতাম ! তোমার কলেজে ফাইনাল ইয়ার ছিল আর আমার প্রিভি ! আমি জানতাম তুমি কলেজ ছেড়ে চলে
যাবে, কিন্তু আমি ভাবতে পারিনি তুমি হটাৎ শেষ পরীক্ষা দিয়ে সেই দিন চলে যাবে ! পরীক্ষার আগে যে ফেয়ারওয়েল হয় সেই স্মৃতি ছাড়া আমার কাছে তোমার কোনো চিহ্ন ছিলোনা যা দিয়ে তোমাকে খুঁজতাম !আমি খবর পেয়ে ছিলাম তুমি কনভোক্যাশনে আসচ্ছ আমি তখন এলাহাবাদ ইউনিভার্সিটি তে প্রফেসর অরুণ কুমার দে স্যারএর কাছে রিসার্চ করছিলাম কিন্তু বিধাতার বিধান রাস্তায় আমার ট্যাক্সি এক্সিডেন্ট করলো আমিও দুর্ঘটনায় আহত হলাম ! আমার সুস্থ হতে দিন পনেরো লাগলো ! তোমার ফটো জোগাড়করে তারপর আমার পরের বছর কনভোকেশনের ফটোর সাথে এনলার্জ করে আমার বাসাতে রেখেছি ! তোমার হয়তো গল্প মনে হচ্ছে, তবে এই দেখো তোমার কত ফটো আমার কাছে আছে ! আমি সব কলেজের ফাইল থেকে আর কিছু তোমার বন্ধুদের কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছি,তোমার বন্ধুরা নিশ্চিত ছিল যে আমাদের মিলন হবে !
আমি সুধার কোথায় অভিভূত হয়ে গেলাম আর ভাবতে লাগলাম কোনো মেয়ে কাউকে এভাবে কি করে ভালো বাসতে পারে ?
তখন রাত আটটা বেজে গিয়েছিলো ভেন্ডার এসে জিজ্ঞাসা করলো ডিনার চাই কিনা আমি দু প্লেট ভাত আর ফুল রোস্ট চিকেন এর অর্ডার দিলাম সুধা বললো এক প্লেট ভাত দিয়ো কিন্তু সব প্লেটে দেবে ফয়েল করে দেবে না ! আমার কাছে আরো খাবার আছে বলে সুধা নিজের ব্যাগ থেকে খাবার বার করলো ! ভেন্ডার যেই খাবার দিয়ে গেলো সুধা ওকে পেমেন্ট করে দিলো ! আমি বললাম একি করছো সুধা আমি তোমার সিনিয়র এটা আমার প্রিভিলেজ আমার এতদিনের পুরোনো বন্ধু কে কেন বঞ্চিত করছো ? বেশ করছি এটা যদি আগে করতাম তাহলে আজ আমি সংসারী হতাম !
আমরা দুজনেই বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে স্লিপিং স্যুট পরে খেতে বসলাম ! সুধা বললো স্যার আমার একটা অনুরোধ রাখবেন আমি বললাম একটা না তুমি যা বলবে আমি মানতে বাধ্য, যদিও অজান্তে তোমাকে কষ্ট দিয়েছি কিন্তু তার কিছু প্রায়শ্চিত্ত তো করতে হবে !
আমি বললাম বলো কি তোমার অনুরোধ, সুধা বললো কিছুনা শুধু তোমাকে আজ আমার হাতে খেতে হবে বলে আমার গদিতে এসে বসলো!
সুধা মুরগির ঝোল দিয়ে ভাত মাখলো আর আমাকে খাওয়াতে থাকলো !আমি বললাম সুধা তুমিও খাও ও বললো তুমি খাইয়ে দাও ! এইভাবে আমাদের দুজনের মধ্যেকার ঘনিষ্ঠতা বাড়তে লাগলো ! সুধা কি সেন্ট মেখেছিলো জানিনা তবে অদ্ভুত একটা মাদকতার সৃস্টি করেছিল ওকে অপূর্ব সুন্দরী লাগছিলো !আমাদের খাওয়া শেষ হতে হতে প্রায় রাত বারোটা বেজে গেলো !
সুধা বললো আমার দ্বিতীয় আবদার তুমি কিশোরে কুমারের সেই গানটা করো যেটা শুনে কলেজের মেয়েরা নাচতে শুরু করেছিল --আমি বলছি লিরিক্স -
শাওন জো আগান লাগায়ে , উসে কাউন বুজায়ে ?
আমি বললাম এতদিন পরে এই গানটা গাইতে পারবো ? সুধা বললো গয়না প্লিজ !
আমি বহুদিন পরে গানটা গাইলাম সুধা আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার গালে একটা চুমু খেলো আর ওর দুই চোখ দিয়ে
ঝড় ঝড় করে জল পড়তে লাগলো !আমি সুধার বন্ধন মুক্ত হয়ে, ন্যাপকিন দিয়ে ওর চোখ মুছতে লাগলাম !
ভাবছিলাম আমার "বাংলা লিখুন" এর বন্ধুদের কথা, তারা কি পড়তে ভালো বাসে,পছন্দ করে, আনন্দ পায়
ইত্যাদি ! এইসব ভাবছি এমন সময় শুনলাম রবি ঠাকুরের আবৃতি "হটাৎ দেখা" আর আমার মনে পড়লো এই গল্পটা !সঙ্গে সঙ্গে লিখে ফেললাম মনে হয় বন্ধুদের ভালো লাগবে !
=================================
সুধা আমার থেকে দু বৎসর জুনিয়ার ছিল কলেজ ! আমি একবার ক্লাসে গাড্ডা খাওয়াতে ও আমার এক ক্লাস নিচে
হলো ! সুধা ওর বাবার ভোপাল থেকে ট্রান্সফার হওয়ার দরুন সেখান থেকে আমাদের শহরে এসেছিলো ! একদিন আমি একলা কেমিস্ট্রি ল্যাবে বসে একটা নোট লিখছিলাম হটাৎ সুধা এসে আমাকে নমস্কার করে বললো স্যার আমার নাম সুধা আমাকে একটু হেল্প করবেন ?
এটা আমাদের প্রথম মিলন ছিল আর আমি সুধা কে জানতাম না আর আগে দেখিনি কোনো দিন ! আমি ওর দিকে তাকালাম মেয়েটি বেশ সুন্দর লম্বা চুল দেখতে বেশ ভালোই ! আমি ওকে প্রতি নমস্কার করে বললাম এই ল্যাবে অন্য স্টুডেন্টদের ঢোকা ব্যারন তুমি জানো ?
সুধা বললো জানি স্যার তবে আপনাকে একলা পাবো বলে এসেছি !
আমি বললাম একলা মানে তুমি কি করতে চাও ? ও বললো কিছু না এই এপ্লিকেশন ফর্ম টা ভরতে একটু সাহায্য করলে বাধিত হবো !
আমি বললাম এই কথা, আমি তো ঘাবড়ে গিয়েছিলাম,এই ভেবে কি তোমার মতো একজন সুন্দরী আমার কাছে কি চায় ? সুধা লজ্জা পেলো আর বললো ধন্যবাদ স্যার আপনিও খুব চারমিজি আর হ্যান্ডসম ! আমি বললাম "মাকাল ফল" আমি কোনো কর্মের নয় একবার গাড্ডা খেয়েছি ! সুধা বললো এরকমটি আর বলবেন না স্যার !
আমি বললাম সুধা এখন ক্লাস শুরু হবে তুমি একটার পরে এস কিংবা ফর্মটা আমার কাছে রেখে যাও আমি ভরে জমা করে দেব ! সুধা আমাকে ফর্ম দিয়ে চলে গেলো !
আমি তো ফর্ম ভরতে গিয়ে অবাক হলাম সুধার এডুকেশনাল ব্যাকগ্রাউন্ড দেখে, সে অসাধারণ মেধাবী ছাত্রী সমানে ফার্স্ট সেকেন্ড হয়ে আসছে ! আর ও ন্যাশনাল স্কলারশিপ হোল্ডার ! পাস্ করলেই চাকরি !
আমার নিজেরই লজ্জা হচ্ছিলো ওর সঙ্গে ওই ভাবে কথা বলার জন্য ! ভাবলাম একবার সরি বলবো ! তার পর দু একবার সুধার সাথে করিডরে দেখা হয়ে ছিল আর নমস্কার বিনিময় হয়েছিল ! কিন্তু আমার মনে সবসময়ে ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স ছিল আর আমি ভাবতাম আমিও যদি মন দিয়ে পড়া শোনা করতাম তাহলে সুধার সাথে বন্ধুত্ব করতাম ! যাক যা হবার নয় তা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নাই !
আমি পরীক্ষার পর আসানসোল বাবার কাছে চলে এলাম ! বাবা যে কোম্পানিতে কাজ করতেন সেই কোম্পানি আমার জন্য কাজ জোগাড় করে দিলো !
জুন মাসে খবরের কাগজে রেজাল্ট বেরোলো আমি আমার ফাইনাল রেজাল্ট টা দেখার পর সুধার রেজাল্ট দেখলাম !
পরের বছর কনভোকেশনে গেলাম ডিগ্রি নিতে ! সেখানে গিয়ে শুনলাম সুধা সেই বছর ইউনিভার্সিটি তে টপ করে স্কলারশিপ নিয়ে ডক্টরেটে করছে ! মনে মনে ভাবলাম এত ভাল স্টুডেন্ট, হওয়া উচিত আমার মত গাড্ডা খাওয়া স্টুডেন্ট তো নয় ! তবে জেনে আশ্চর্য হলো যে সুধা আমার খোঁজ করতো আর আমি যে বাসায় থাকতাম সেখানে গিয়ে খোঁজ খবর নিয়েছে অনেকবার আমি এখন কোথায় আছি !
আমি ডিগ্রি নিয়ে চলে আসলাম ! আমার কর্ম ক্ষেত্রে যে গুরু ছিলেন তিনি আমাকে ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স থেকে বের করলেন তিনি আমাকে বললেন ডিগ্রি শুধু মাত্র তোমাকে শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রদান করে ! তুমি কাজকে ভালোবাস তুমি কাজে প্রথম হও !আমি সংকল্প নিলাম খুব মন দিয়ে কাজ করবো যাতে কাজে প্রথম হতে পারি !
এরপর আমার বিবাহ হলো সন্তান হলো আমি সুধা কে ভুলে গেলাম ! এরপর আমি ডক্টরেটে করলাম আর কর্ম ক্ষেত্রে প্রমোশন পেতে পেতে জেনারেল ম্যানেজার পদে পদস্থ হলাম !
তখন আমার বিরাট প্রতিপত্তি ! বিরাট ল্যাবরেটরি আমার কন্ট্রোলে বহু রিসার্চ হচ্ছে দেশে বিদেশে আমার লেখা আর্টিকেল ছাপছে ! আমি এডুকেশন ফিল্ডে থাকলে এসব কিছুই হত না মনে হয় ! কিন্তু সুধার কাছ থেকে অদৃশ চাপ সৃষ্ঠি না হলে হয়ত মাস্টার মশাই হয়ে পড়াতাম আর পড়ানতে সুখ্যাতি পেতাম কিনা তাতেও সন্দেহ আছে !
একবার আমি প্রতিরক্ষা দপ্তরের অনুরোধে হটাৎ একটি বিশেষ অ্যালুমিনিয়াম আলোয় সংক্রান্ত ব্যাপারে হায়দরাবাদ গিয়ে ছিলাম ! পুজোর ছুটির দরুন ট্রেনে /প্লেনে কোনো জায়গা পাওয়া যাচ্ছিলোনা প্রতিরক্ষা দপ্তরের কোটাও ফুল তবে একজন এজেন্ট বলেছে যে একটা এসি ফার্স্ট ক্লাসকূপে তে একটা সিট খালি আছে নাগপুর পর্যন্ত আর নাগপুর থেকে আমাকে বাই রোড যেতে হবে ! আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম আর সন্ধ্যা বেলা আমাকে প্রতিরক্ষা বিভাগের লোকেরা দলবল নিয়ে এসে আমাকে কেবিন এ তুলে দিয়ে গেলো !
গাড়ি ছাড়লেপরে আমি দেখলাম আমার সহযাত্রী একজন মহিলা ! আমি নমস্কার করে মহিলা কে বললাম সরি ম্যাডাম আপনাকে বিরক্ত করবার জন্য !
হটাৎ আমার মনে হলো মহিলাকে যেন কোথাও দেখেছি !মহিলা আমাকে নিজের পরিচয় দিলেন ভাইস চ্যান্সেলর নাগপুর ইউনিভার্সিটি মিস সুধা শ্রীবাস্তব আমি বললাম আমার নাম প্রদীপ মৈত্র ! মহিলা আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন স্যার আপনি ? আমি বললাম সুধা তুমি ?
আমি ভালো করে চেয়ে দেখলাম সুধা সেই আগের মতোই আছে চুল পেকেছে চশমা লেগেছে ! সুধা বললো তোমার এক মাথা টাক দেখে তোমাকে চিনতে পারিনি ! সুধা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমার কথা শুনলো !
আমি বললাম তোমার কথা বলো !সুধা বললো আমার কোনো কথা নাই নিঃসঙ্গ জীবন !
আমি বললাম তুমি বিয়ে করোনি ? সুধা বললো আমার মতো বিদুষি মহিলা কে বিয়ে কে করবে ? যে করতে পারতো সে তো আর ধরা দিলোনা ! তাই আমি একাকিনী ! আমি জিজ্ঞাসা করল কে সেই হতভাগা যে তোমার মতো সুন্দরী আর বিদুষিকে প্রত্যাখ্যান করেছে ! সুধা বললো এখন আর বলতে দোষ নাই সে আমার সামনে বসে আছে !
আমি বললাম সে কি সুধা তুমি তো কখনো আমাকে তোমার মনের কথা বলোনি ?
কি করে বলবো প্রথম দিন তুমি আমাকে লিফ্ট দিলে না বরঞ্চ আমার আবার তোমার সাথে দেখা করার পথ বন্দ করে দিলে আমার এপ্লিকেশন ফর্ম নিজে ভরে নিজেই জমা দিয়ে দিলে, আর পরীক্ষার পর শহর ছেড়ে কোথায় চলে গেলে কেউ বলতে পারলোনা !
আমি স্তম্ভিত হয়ে সুধা কে বললাম তোমার আমার বন্ধুত্বের বাধক হয়ে ছিল তোমার ওই এপ্লিকেশন ফর্ম ! সুধা আশ্চর্য্য হয়ে বললো সেটা কি করে ? আমি বললাম তোমার একাডেমিক রেকর্ড দেখে আমি ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স এ ভুগছিলাম তাই তোমার থেকে দূরে চলে গিয়ে ছিলাম, এমনটি নয় যে তোমাকে আমি পছন্দ করিনি !
-----
হটাৎ দেখা ---দ্বিতীয় পর্ব
আমি বললাম সুধা তোমার এতো প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও কেন তুমি আমার মতো একটি সাধারণ ছেলেকে যার কোনো ভবিষৎ নাই, মনের মধ্যে রোমান্টিক ফিলিং নাই তার প্রতি কেন অনুরক্ত হলে ?
সুধা বললো আমার মা বাঙালি ছিলেন আর আমি বাঙালিদের ভালোবাসি আর প্রথম দিন কলেজ এসে তোমাকে দেখে আমার খুব ভালো লেগেছিলো ! তুমি যে কিশোরে কুমারের গান গাইতে কলেজ ফাঙ্কশনে আমি তোমার গান শুনে পাগল হয়ে যেতাম ! তোমার কলেজে ফাইনাল ইয়ার ছিল আর আমার প্রিভি ! আমি জানতাম তুমি কলেজ ছেড়ে চলে
যাবে, কিন্তু আমি ভাবতে পারিনি তুমি হটাৎ শেষ পরীক্ষা দিয়ে সেই দিন চলে যাবে ! পরীক্ষার আগে যে ফেয়ারওয়েল হয় সেই স্মৃতি ছাড়া আমার কাছে তোমার কোনো চিহ্ন ছিলোনা যা দিয়ে তোমাকে খুঁজতাম !আমি খবর পেয়ে ছিলাম তুমি কনভোক্যাশনে আসচ্ছ আমি তখন এলাহাবাদ ইউনিভার্সিটি তে প্রফেসর অরুণ কুমার দে স্যারএর কাছে রিসার্চ করছিলাম কিন্তু বিধাতার বিধান রাস্তায় আমার ট্যাক্সি এক্সিডেন্ট করলো আমিও দুর্ঘটনায় আহত হলাম ! আমার সুস্থ হতে দিন পনেরো লাগলো ! তোমার ফটো জোগাড়করে তারপর আমার পরের বছর কনভোকেশনের ফটোর সাথে এনলার্জ করে আমার বাসাতে রেখেছি ! তোমার হয়তো গল্প মনে হচ্ছে, তবে এই দেখো তোমার কত ফটো আমার কাছে আছে ! আমি সব কলেজের ফাইল থেকে আর কিছু তোমার বন্ধুদের কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছি,তোমার বন্ধুরা নিশ্চিত ছিল যে আমাদের মিলন হবে !
আমি সুধার কোথায় অভিভূত হয়ে গেলাম আর ভাবতে লাগলাম কোনো মেয়ে কাউকে এভাবে কি করে ভালো বাসতে পারে ?
তখন রাত আটটা বেজে গিয়েছিলো ভেন্ডার এসে জিজ্ঞাসা করলো ডিনার চাই কিনা আমি দু প্লেট ভাত আর ফুল রোস্ট চিকেন এর অর্ডার দিলাম সুধা বললো এক প্লেট ভাত দিয়ো কিন্তু সব প্লেটে দেবে ফয়েল করে দেবে না ! আমার কাছে আরো খাবার আছে বলে সুধা নিজের ব্যাগ থেকে খাবার বার করলো ! ভেন্ডার যেই খাবার দিয়ে গেলো সুধা ওকে পেমেন্ট করে দিলো ! আমি বললাম একি করছো সুধা আমি তোমার সিনিয়র এটা আমার প্রিভিলেজ আমার এতদিনের পুরোনো বন্ধু কে কেন বঞ্চিত করছো ? বেশ করছি এটা যদি আগে করতাম তাহলে আজ আমি সংসারী হতাম !
আমরা দুজনেই বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে স্লিপিং স্যুট পরে খেতে বসলাম ! সুধা বললো স্যার আমার একটা অনুরোধ রাখবেন আমি বললাম একটা না তুমি যা বলবে আমি মানতে বাধ্য, যদিও অজান্তে তোমাকে কষ্ট দিয়েছি কিন্তু তার কিছু প্রায়শ্চিত্ত তো করতে হবে !
আমি বললাম বলো কি তোমার অনুরোধ, সুধা বললো কিছুনা শুধু তোমাকে আজ আমার হাতে খেতে হবে বলে আমার গদিতে এসে বসলো!
সুধা মুরগির ঝোল দিয়ে ভাত মাখলো আর আমাকে খাওয়াতে থাকলো !আমি বললাম সুধা তুমিও খাও ও বললো তুমি খাইয়ে দাও ! এইভাবে আমাদের দুজনের মধ্যেকার ঘনিষ্ঠতা বাড়তে লাগলো ! সুধা কি সেন্ট মেখেছিলো জানিনা তবে অদ্ভুত একটা মাদকতার সৃস্টি করেছিল ওকে অপূর্ব সুন্দরী লাগছিলো !আমাদের খাওয়া শেষ হতে হতে প্রায় রাত বারোটা বেজে গেলো !
সুধা বললো আমার দ্বিতীয় আবদার তুমি কিশোরে কুমারের সেই গানটা করো যেটা শুনে কলেজের মেয়েরা নাচতে শুরু করেছিল --আমি বলছি লিরিক্স -
চিঙ্গারি কোই ভড়কে, তো শাওন উসে বুজায়ে
শাওন জো আগান লাগায়ে , উসে কাউন বুজায়ে ?
আমি বললাম এতদিন পরে এই গানটা গাইতে পারবো ? সুধা বললো গয়না প্লিজ !
আমি বহুদিন পরে গানটা গাইলাম সুধা আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার গালে একটা চুমু খেলো আর ওর দুই চোখ দিয়ে
ঝড় ঝড় করে জল পড়তে লাগলো !আমি সুধার বন্ধন মুক্ত হয়ে, ন্যাপকিন দিয়ে ওর চোখ মুছতে লাগলাম !
লেখক --ড্: প্রদীপ কুমার মৈত্র ২৭/১০ /১৭
No comments:
Post a Comment