Monday, February 12, 2018

পুনর্মিলন

এই ঘটনাটা  এক মাতা পুত্রের পুনর্মিলনের, যা ঘটেছিলো বিচ্ছেদের প্রায় ২৫ বৎসর পর !
আমাদের পাড়ায় এক ভদ্রলোক থাকতেন তার নাম ছিল শশী বাবু, তিনি আন্দামানের পোর্ট ব্লেয়ার শহরের  পুলিশ ট্রেনিং স্কুলে কাজ করতেন, আর বছরে একবার করে ছুটিতে আসতেন আমরা তাকে ওখানকার গল্প বলতে বলতাম, তখন তিনি এই পুনর্মিলনের গল্পটা একবার বলেছিলেন সেই গল্পটা আমি আপনাদের শোনাচ্ছি !
পুলিশ ট্রেনিং স্কুলটা ছাত্রদের ট্রেনিং সমাপ্ত হওয়ার পর অনেক দিন বন্দ  থাকতো ! সেই সময় শশী বাবুর একবার ডিউটি পড়েছিল ছুটির সময় পুরো তিন মাস স্কুলে থেকে  স্কুলের হেফাজত করা ! কিন্তু সমস্যা  ছিল স্কুলের আসে পাশে কোনো বসতি ছিলোনা আর স্কুল থেকে বাইরে যাওয়ার কোনো অনুমতি ছিলোনা ! অগত্যা শশী বাবুর  স্কুল থেকে কোয়াটার আর কোয়াটার থেকে স্কুল এই ছিল তার রোজ নামচা আর গেটের  কাছে একটা চেয়ার নিয়ে শুন্য পথের দিকে তাকিয়ে থাকা ! এর মধ্যে একটাই ব্যতিক্রম ছিল যে সকাল বেলা এক রাখাল ছেলে বাঁশি বাজিয়ে তার ছাগল নিয়ে গেটের সামনে দিয়ে যেত তাই দেখা !
একদিন সেই রাখাল ছেলে এসে শশী বাবুকে বললো সায়েব একটু জল দেবেন ? শশী বাবু তো হাতে স্বর্গ পেলেন বললেন  আলবাত দেব আর তোমার ছাগলদের জন্যও পাবে !রাখাল বললো সায়েব  আমার নাম গোপী আর আমি আমার মালিক ভূষণ বাবুর ছাগল চড়াই ! শশী বাবু খুশি হয়ে বললেন গোপী তোমার বাড়ি  কোথায় ?
গোপী বললো বিধান নগর, বেনারস শহরের পাশে একটা গ্রামে ! শশী বাবু বললেন  তোমার বাড়িতে কে কে আছেন ?
গোপী বললো সায়েব আমার মা, বাবা ভাই আছে !
পরেরদিন শশী বাবু, রাখাল ছেলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন কখন সে আসবে আর তার সাথে কথা বলবেন ! গোপী আসতেই তাকে আর তার ছাগল গুলো কে জল খেতে দিলেন,আর বললেন গোপী তুমি এত সুন্দর বাঁশি বাজাও তুমি কার কাছে বাঁশি বাজানো শিখেছো ?
গোপী বললো নিজে নিজেই বাজাতে বাজাতে শিখেছি  !
শশী বাবু বললেন  গোপী আমি এখানে একলা থাকি আমার সহকর্মীরা সব ছুটিতে গেছে  আমার বাসা তে আমার মা আছেন আর আমার স্ত্রী তার পিত্রালয় আছে সেখানে সে একটা ব্যাংকে চাকরি করে ! তোমাকে দেখে আমার মনে হয় তোমার মনে কোনো দুঃখ বেদনা আছে যা তুমি  কাউকে বলতে চাও, তাই আমার তোমার সাথে গল্প করার খুব ইচ্ছে হচ্ছে, তুমি তোমার গল্প বলো আমি শুনি ! গোপী বললো সাহেব আমি খুব অল্প বয়সে বাডি  ছেড়েছি আমার কিছু মনে নেই ! শশী বাবু বললেন দেখো গোপী আমি পুলিশের লোক আমাকে মিথ্যা কথা বলোনা !তুমি অনেক কিছু জানো যা তুমি আমার কাছে লুকাচ্ছো ! গোপী বললো ঠিক বলেছেন বাবু আমি কিছু জানি কিন্তু আমার মালিক ভূষণ বাবু আর ওনার স্ত্রী রাধা বৌদি আমাকে, কোনো বাইরের লোকের সাথে কথা বলতে বারণ করেছে ! শশী বাবু বললেন ঠিক আছে আমি যখন তোমার কাছে বাইরের লোক তখন তোমাকে বলতে হবে না ! গোপী বললো বাবু আপনি আমার কাছে নিজের লোকের মতন, আপনি যখন জানতে চাইছেন তখন বলছি !
গোপীর কথা
 আমি যখন প্রায় ১০ বছরের তখন আমার ইচ্ছে হলো মার জন্য একটা লাল রঙের শাড়ি কিনবো, কিন্তু টাকা কোথায় পাই ? আমার বন্ধুরা বললো গ্রামের ঠাকুর (জমিদার) অনেক লোক খাটায় তার কাছে যাও, সে তোমাকে কাজে দিতে পারে ! তখন আমি ঠাকুরের কাছে কাজ চাইতে গেলাম আর কাজ পেয়েও গেলাম !এক মাস পরে যখন আমি টাকা চাইতে গেলাম তখন ঠাকুর বললো বাচ্চাদের  কোনো মাস মাইনে হয় না ! আমি ঠাকুর কে অনেক অনুরোধ করলাম কিন্তু সে কিছুতেই টাকা দিলোনা ! তখন আমি রেগে গিয়ে ঠাকুরকে গালাগাল করলাম ! ঠাকুর রেগে বললো তোর এতো আস্পর্ধা যে আমাকে গাল দিলি, আমি তোকে গুলি করে মারবো এই বলে ঘর থেকে বন্দুক আনতে গেলো, আর জমিদারের লোকেরা আমাকে ছুটে পালতে বললো, আর আমি ছুটতে লাগলাম আর জমিদার পেছন থেকে চাঁচাচ্ছিলো, ধরেআন বেটাকে আজ ওকে গুলি করে মারবো ! কিছুক্ষন ছোটার পর দেখলাম দূরে কিছুলোক লাঠি নিয়ে আমাকে তেড়ে আসছে তাই দেখে আমার আরও ভয় করতে লাগলো আর আমি আরও জোরে ছুটতে লাগলাম আর একটা গাছের তলায় এসে শুয়ে পড়লাম ! কতক্ষন গাছের তলায় ছিলাম জানিনা তবে লোকজনের চেঁচামেচিতে উঠে দেখি একটা বাস থেকে লোকজন নামছে ! আমি সেই বাসে চেপে বসলাম আর ঘুমিয়ে গেলাম ! বাসের কন্ডাক্টর আমাকে টেনে বাস থেকে নামিয়ে দিলো একটা শহরে, মনে হয় সেই শহরটা বেনারস ছিল ! সেখানে কেউ আমার গ্রামের নাম জানতো না ! আমি একটা হোটেলে ঢুকে কাজ চাইলাম আর কাজ পেলাম ! কিছুদিন পর এক বন্ধুও জুটে গেলো ! একদিন  আমার বন্ধু বললো সে একটা কাজ পেয়েছে আন্দামানে আর আমি ইচ্ছে হলে তার সাথে যেতে পারি ! আমি বললাম আন্দামান কোথায় ? বন্ধু বললো সমুদ্রের মাঝখানে  একটা বড় শহর ! যে লোক আমাদের নিয়ে যাবে সে টিকিট কাটবে  আর থাকা খাবার সব ব্যবস্থা করবে ! আমি রাজি হয়ে গেলাম আর সেই বন্ধুর সাথে এসে আন্দামান শহরে একটা কারখানাতে চাকরি করতে লাগলাম ! কিছুদিন পর এক ভীষণ সমুদ্র গর্জন হলো আর শহরের কারখানাটা ধ্বংস হয়ে গেলো ! শশী বাবু বললেন সুনামি ২০০৪ সালে হয়ে ছিল ? গোপী বললো হ্যাঁ সায়েব, তাতে বহু লোক মারা যায়, ভগবানের কৃপায় আমি বেঁচে গেলাম কিন্তু বন্ধু কে হারিয়ে আবার একলা হলাম ! সেই সময় আমি যে হাসপাতালে ছিলাম সেখানে আমার মালিক, ভূষণ বাবু  আমার ভালো হওয়ার পর নিজের বাড়ি নিয়ে আসলেন ! সেই থেকে  আমি ওনার কাছেই থাকি, ছাগল চড়াই আর বাঁশি বাজাই ! শশী বাবু বললেন এখন তো তুমি বড় হয়েছে, তোমার বেতন দিয়ে তুমি তোমার মায়ের জন্য শাড়ি কিনতে পারো তাইনা ?
গোপী বললো না সাহেব, ভূষণ বাবু বলেছেন যখন আমি আমার গ্রামে যাবো তখন উনি আমার থাকা খাবার আর বস্ত্রের টাকা কেটে নিয়ে আমার বেতন দেবেন ! আর টাকা দিয়ে আমি কি করবো সাহেব ? আমি জানিনা আমার গ্রাম কোথায় ?
শশী বাবু বললেন গোপী আমি চেষ্টা করবো তোমার মা আর তামার বাড়ি খুঁজে  বার করতে ! তুমি শুধু তোমার গ্রামের নাম ঠিক করে বলো ? গোপী বললো বিধান নগর ! শশী বাবু বললেন তুমি আমাকে আগে বলে ছিলে কিন্তু  আমি বিধান নগর নামে  কোনো গ্রাম বেনারসের আসে পাশে খুঁজে পাইনি তুমি আরও ভালো করে চিন্তা করে দেখো নামটা তুমি ঠিক বলছ কিনা ? গোপী বললো এখন থেকে
পরের দিন গোপী এসে বললো সায়েব জায়গাটার নাম বিধানপুর হবে ! আমি বোধ হয় ভুল বলেছিলাম ! শশী বাবু
সঙ্গে সঙ্গে ওনার স্ত্রী কে ফোন করে বললেন যে উইকিমাপিয়া  তে খুঁজে দেখো বেনারসের পাশে  বিধানপুর   বলে কোনো গ্রাম আছেকিনা ? আর যদি থাকে তাহলে সেই গ্রামে কোনো ব্যাঙ্ক,পুলিশ স্টেশন কিংবা পোস্ট অফিস আছে কিনা ?
তৃতীয়  খন্ড
কিছুক্ষন পরে শশী বাবুর স্ত্রী ফোন করে জানালেন যে বেনারসের পাশে বিধানপুর নাম একটি গ্রাম আছে কিন্তু ওখানে ব্যাঙ্ক,পোস্ট অফিস বা থানা নাই ! ওটা একটি সামান্য গ্রাম, কিন্তু ওই গ্রাম থেকে  ৫ কিলোমিটার দূরে আমার  ব্যাংকের একটা ব্রাঞ্চ আছে  আর সেখানের  একজন কর্মী বিধানপুরে থাকে আমি সেই ভদ্রলোকের ফোন নম্বরটা দিলাম তার সাথে কথা বলে দেখো মনে হয় তোমার চেষ্টা সফল হবে !
শশী বাবু স্ত্রীর দেয়া নম্বরে ফোন করলেন আর ভদ্রলোকের সাথে কথা বললেন ! সেই ভদ্রলোক জানালেন অনেক বছর আগে গোপী নামের একটি ছেলে গ্রাম থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে ছিল আমি তার ছোট ভাই কে চিনি আর তার ফোন নম্বরটা আপনাকে পাঠাচ্ছি !শশী বাবু ফোন নম্বর নিয়ে গোপীর ভাইয়ের সাথে কথা বললেন ! ছোট ভাই আনন্দে আত্মহারা হয়ে ভাই ভাই করতে লাগলো ! শশী বাবু বললেন শীঘ্রই তোমাদের কথা হবে !

এর মধ্যে স্কুলের ছুটি শেষ হওয়ার পর, নুতন সেশন আরম্ভ হয়েছিল, কিন্তু গোপী আর এদিকে আসছিলোনা ! শশী বাবুর মনে একটু সন্দেহ হলো সে নিজের দল বল নিয়ে ভূষণ বাবুর বাড়ি গেলেন গোপী কে খুঁজতে ! ভূষণ বাবু ও তার স্ত্রী হটাৎ পুলিশ দেখে একটু ঘাবড়ে  গেলেন আর মিথ্যে কথা বললেন যে গোপী তার দেনা পাওনা নিয়ে চলে গেছে ! শশী বাবুর সন্দেহ হলো যে গোপী এখানেই আছে, সে জোরে জোরে গোপীর নাম ধরে ডাকতেই গোপী ছুটে এসে হাজির হলো আর বললো আমাকে ক্ষমা করবেন, আমার মালিক আমাকে আপনার থেকে দূরে থাকতে বলেছেন আর বলেছেন যে আপনি আমাকে বিক্রি করে দেবেন ! শশী বাবু গোপী কে বললেন আমি সরকারি কর্মচারী, আর তোমার মালিকদের মতো ভন্ড আর মিথ্যাচারী লোকেদের ধরে দেশের আইনের হেফাজত করাই  আমার কাজ ! এখন তুমি তোমার ভাইয়ের সাথে আর মার সাথে কথা বোলো ! এই বলে তিনি গোপীর ভাইয়ের ফোন নম্বর লাগলেন ! গোপীর ভাই তিনদিন ধরে ফোনের অপেক্ষা করছিলো ! দুই  ভাই ব্যাথিতো  হৃদয় নিয়ে কাঁদতে লাগলো আর কথা বলতে লাগলো !
শশী বাবু ভূষণ বাবু কে বললেন মানুষ কে বন্দি করে রাখার আর বিনা মাইনেতে লোক খাটানোর জন্যে তোমার  শাস্তি হবে, আর ভূষণ বাবু কে বললেন গোপী আপনাদের কাছে কত দিন ধরে কাজ করছে ? ভূষণ বললো ১৮ বৎসর ধরে! শশী বাবু বললেন এবার আপনি গোপীর ১৮ বছরের মাইনা  সুদ সমেত হিসাব করুন, আর গোপীর ব্যাঙ্ক একাউন্ট আমরা খুলে দিচ্ছি, সেই  খাতাতে   আপনি টাকা জমা দিন, অন্যথা  আমরা আপনার নামে মোকর্দমা করবো !  তখন ভূষণ বললো এতো টাকা আমি কোথায় পাবো ! শশী বাবু বললেন আপনি হিসাব করুন তারপর আমি বলবো আপানি কোথায় টাকা পাবেন ! দরকার হয় যদি তাহলে আমাদের উকিল আর একাউন্টস ক্লার্ক এসে  আপনাকে সাহায্য করতে পারে কিন্তু তাতে আপনার আরও অসুবিধে হতে পারে !
শশী বাবু গোপীকে সাথে করে পুলিশ ট্রেনিং স্কুলে নিজের কোয়াটারে আনলেন এবং মায়ের কাছে প্রস্তুত করলেন ! গোপী মাকে  প্রণাম করে বললো  মা আমি একজন রাখাল আপনার ছেলে আমার জন্য কত কি করলেন আর আমার পরিবারের সাথে কথা বলার ব্যবস্থা করেছেন ! শশী বাবুর মা গোপীকে বললেন তুমিও আমার ছেলের মতো আর তোমার ভাই তোমার জন্য আর একজন জনারণ্যে হারিয়ে যাওয়া ভারত বাসীকে তার পরিবারের কাছে পাঠানের ব্যবস্থা করেছে এটা ওর কর্তব্য, ও তাই নিজের কর্তব্য পালন করেছে, আমি তোমাকে আশীর্বাদ করছি তুমি ভালো ভাবে নিজের বাড়ি গিয়ে তোমার মায়ের চোখের জল মুছে দাও !
পরের দিন ভূষণ বাবু গোপীর টাকা আর জাহাজের টিকিট কিনে নিয়ে আসলো শশী বাবুর মা গোপীর মার্ জন্য লাল রঙের শাড়ি দিলেন আর গোপীর সাথে যাওয়ার জন্য মন্দিরের পুরুত মশাই কে নিযুক্ত করলেন ! গোপী শশী বাবুকে বললো আপনি আমার দাদার মতো কাজ করেছেন আপনাকে একটা প্রণাম করতে চাই ! শশী বাবু গোপীকে বুকে জড়িয়ে আশীর্বাদ করলেন ! গোপী সবার থেকে বিদায় নিয়ে জাহাজে চড়লো আর নিরাপদে কলকাতা হয়ে ট্রেনে বেনারস পৌঁছলো মন্দিরের পুরুত মশাইয়ে সাথে !  গোপীর ছোট ভাই স্টেশনে এসে দাদার সাথে দেখা করলো আর দুই ভাই গলা জড়িয়ে খুব কাঁদলো ! দুই ভাই গ্রামে এসে দেখে লোকে লোকারণ্য পুরো গ্রাম বাসীরা গোপীকে দেখবার জন্য দাঁড়িয়ে আছে ! গোপী ঘরে ঢুকে মাকে  জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদলো আর মাকে লাল শাড়ি দিলো ! এরইমধ্যে শশী বাবুর ফোন আসলো আর সে বললো গোপী কেমন লাগছে ? গোপী বললো দাদা আমরা এখন থেকে তিন ভাই ! তোমার ছোট ভাইয়ের অনুরোধ তুমি একবার আমার বাড়িতে এসে আমার মাকে তোমার মুখ দেখাও ! শশী বাবু বললেন নিশ্চই আসবো !

নোট-বন্ধুগণ এখানে সব চরিত্রই কাল্পনিক তবে বাস্তবিক জগতে এই পুলিশ কর্মচারীকে  তার কর্তব্য পালন আর নিষ্ঠার সাথে মানবিকতার পরিচয় দেয়ার জন্য তাকে সরকার পুরস্কৃত করেছিলেন !
Dr P K Maitra















No comments:

Post a Comment